opennews.com.bd
  • | |
  • cnbangladesh.com
    cn.com
    cn.com
    cn.com
    cn.com
cnbangla.com
স্বাস্থ্য

যে শহরে এইডস রোগের জন্ম


Date : 12-31-15
Time : 1451548935

cnbangladesh.com

৩৫ বছর আগে যখন মার্কিন চিকিৎসকেরা প্রথম এইডস রোগের মুখোমুখি হয়েছিলেন, তখন কেন এটা তাদের কাছে রহস্যময়, দুর্বোধ্য ও ভীতিকর মনে হয়েছিল সেটা অনুধাবন করাটা বোধ হয় খুব একটা কঠিন কাজ না। কারণ তারা দেখেছিলেন কিভাবে অল্প বয়স্ক স্বাস্থ্যবান প্রাণ প্রাচুর্যে ভরপুর মানুষ এই রোগের কবলে পড়ে হঠাৎ হারিয়ে ফেলছেন তাদের শরীরের সমস্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা এবং হয়ে পড়ছেন হাড় জিরজিরে দুর্বল। রোগের থেকে ভয়ঙ্কর ব্যাপার দাঁড়িয়েছিল রোগের উৎপত্তি বুঝতে না পারাটা। ডাক্তারদের ভয়ের মুল কারণটা ছিল এই যে, রোগটা ঠিক কোথা থেকে এসে আক্রমণ করছে তা তারা বুঝতে পারছিলেন না।    

আজকে আমরা এইডস রোগ সম্মন্ধে তাদের থেকে অনেক বেশি কিছু জানি। যে এইচআইভি ভাইরাসের কারণে এই রোগ ছড়ায় সেটা এখন বিশ্বব্যাপী বিস্তৃত। যৌনকর্মীরা যে অনিচ্ছাকৃতভাবে এখানে ভুমিকা রেখেছেন সেটা মোটেও অবাক করার মত বিষয় না। কিন্তু একইসাথে ব্যাবসা, উপনিবেশিকতার অবসান এবং বিংশ শতকের সামাজিক রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাসের ভূমিকা ছিল আরও প্রবল।      

তবে এইচআইভি ভাইরাস কিন্তু আসলে শুন্য থেকে আবির্ভূত হয় নি। এটা খুব সম্ভবত প্রথম শুরু হয়েছিল পশ্চিম আফ্রিকার দেশের বানর এবং বনমানুষের মধ্যে। সেখান থেকে এটা ছড়িয়ে পড়ে মানুষের মধ্যে। মানুষ যেহেতু গৃহপালিত প্রাণী ছাড়াও অন্যান্য অনেক বন্য প্রাণীর মাংস খায় কাজেই সেখান থেকেও ছড়াতে পারে। যেমন, কিছু কিছু মানুষের শরীরের ভাইরাসের সাথে সুতি ম্যাঙ্গাবে জাতীয় এক প্রকারের বানরের বহনকৃত এইচাইভি ভাইরাসের সাদৃশ্য রয়েছে। কিন্তু বানরের এইচআইভি ভাইরাস মূলত বিশ্বব্যাপী মানুষের মধ্যে ছড়ায়নি, ছড়িয়েছে অন্য কোনো ভাবে।

মানুষের সাথে বানরের চেয়ে বনমানুষের জিনগত মিল অনেক বেশি, বিশেষ করে গরিলা এবং শিম্পাঞ্জী। কিন্তু বনমানুষের থেকেও যদি মানুষের মাঝে এইচআইভি ছড়ায় তাতেও সেটা এতো ব্যপকভাবে ছড়াবে না। বনমানুষের থেকে যে ভাইরাস ছড়ায় সেটা সাধারণত এইচাইভি-১ নামে পরিচিত। এই এইচআইভি-১ এর গ্রুপ হচ্ছে ‘ও’ এবং মানুষের মধ্যে এটার সংক্রান্তি শুধুমাত্র পশ্চিম আফ্রিকার মধ্যে সীমাবদ্ধ।      

মজার বিষয় হচ্ছে, শুধুমাত্র একটি বিশেষ ধরনের এইচআইভি ভাইরাসই মানুষের মাঝে ছড়ানোর পর এতো ব্যাপকভাবে বিস্তৃতি লাভ করেছে। এই ধরনের ভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছে শিম্পাঞ্জী থেকে এবং এটা এইচাইভি-১, গ্রুপ ‘এম’ নামে পরিচিত। ৯০ শতাংশেরও বেশি এইচআইভি সংক্রমণ হচ্ছে এই ‘এম’ গ্রুপের। যে কারণে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে, এইচাইভি-১, গ্রুপ ‘এম’ ভাইরাসের বিশেষত্বটা কি? 

২০১৪ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণার ফলাফল থেকে বেরিয়ে এসেছে চমকপ্রদ এক তথ্য। গ্রুপ ‘এম’ ভাইরাসের আসলে কোনো বিশেষত্বই নেই! এবং এই ভাইরাস এমনকি মারাত্মকভাবে সংক্রামকও নয়। তাহলে কিভাবে এটা এমনভাবে ছড়ালো? দেখা গেছে এই ধরনের ভাইরাস ঘটনা পরাক্রমায় এমনভাবে ছড়িয়েছে। ইংল্যান্ডের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন গবেষক নুনো ফারিয়া বলেছেন, ‘বিবর্তনগত কারণে নয়, বরং পরিবেশগত কারনেই ভাইরাসটি বেশি মাত্রায় ছড়িয়েছে।’ 

গবেষক ফারিয়া এবং তার সঙ্গীরা মিলে আফ্রিকার বিভিন্ন জায়গার প্রায় ৮শ’ এইডস আক্রান্ত মানুষের রক্ত পরীক্ষা করে ব্যতিক্রমী এইচআইভি ভাইরাসের জিনোমের (উভয় গ্রুপের জিন) উপর ভিত্তি করে একটি উৎপত্তিগত ছক তৈরি করেছেন। 
সেখানে দেখা যায়, ভাইরাসের এই জিনোমগুলো পরিবর্তনের সাথে দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে এবং দুটো জিনোমের ধারার মধ্যবর্তী পার্থক্যের তুলনা করে দেখা গেছে দুটোর মধ্যে সেটাই বেশি প্রভাব বিস্তার করে যেটার সাথে তার পূর্ব পুরুষদের মিল বেশি। এই পদ্ধতিটি বিজ্ঞানিদের কাছে খুবই জনপ্রিয়। মানুষের পূর্ব পুরুষ যে ৭০ লাখ বছর আগে বসবাসকারী শিম্পাঞ্জী, সেটা প্রমাণ করার জন্যও এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়।

ফারিয়া বলেন, ‘এইচআইভি যেহেতু আরএনএ ভাইরাস সেহেতু মানুষের ডিএনএর চাইতে প্রায় ১০ লাখ গুণ বেশি গতিতে এটি বিবর্তিত হচ্ছে।’ অর্থাৎ এইচাইভি খুব দ্রুত পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানোর জন্য পরিবর্তিত হচ্ছে এবং ছড়িয়ে পড়ছে। 

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এইচাইভির এই জিনোমের পূর্ব পুরুষ কে এবং কখন তারা বাস করতো পৃথিবীতে? এইখানে ফারিয়া এবং তার সহকারী গবেষকরা পেয়েছেন চমকপ্রদ তথ্য। এই ব্যাতিক্রমি ধরণের এইচআইভি জিনোমদের একটি সাধারণ পূর্বপুরুষ ছিলেন যার অস্তিত্ব পৃথিবীতে ছিল মাত্র ১০০ বছর আগে। কাজেই, এইচআইভি-১, গ্রুপ ‘ম’ সম্ভবত ছড়াতে শুরু করেছিল ১৯২০ সালের দিকে। 

এটা রীতিমত বিস্ময়কর একটি তথ্য। কারণ গবেষকরা এইবার বুঝতে পারছেন এই রহস্যের আরেকটু গভীরে গেলেই তারা বের করে ফেলবেন পৃথিবীর ঠিক কোন জায়গায় বা কোন দেশে উৎপত্তি হয়েছিল এই ভাইরাসের। যে সমস্ত রক্তের নমুনা তারা সংগ্রহ করেছিলেন সেখান থেকে তারা খুঁজে বের করলেন এটার উৎপত্তি হয়েছিল আফ্রিকার কিনশাসা নামের এক জায়গায়। কিনশাসা হচ্ছে বর্তমান ডেমোক্র্যাটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর রাজধানী।

গবেষণার এই পর্যায়ে গবেষকরা হঠাৎ তাদের পদ্ধতি বদলালেন। তারা এইবার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করে খুঁজে বের করার চেষ্টা করলেন কেন ১৯২০ সালে আফ্রিকার একটি শহর থেকে এইচআইভি ভাইরাস ছড়িয়ে পড়েছিল সারা বিশ্বে? ঠিক কি ধরণের ঘটনা ঘটেছিল তখন?

১৯২০ সালে কঙ্গো ছিল বেলজিয়ান কলোনি এবং কিনশাস (তখনকার নাম লিওপল্ডভিল) শহরকে তখন মাত্র রাজধানী করা হয়েছে। এই শহরটি তখন ছিল তরুণদের জন্য খুবই আকর্ষণীয় জায়গা, বিশেষ করে যৌন কর্মীদের জন্য এবং যারা কাজ করে ধনী হতে চায়। ভাইরাসটি তখন এই সমস্ত মানুষদের মাঝে খুব দ্রুত ছড়ায়।

কিন্তু এটা শুধু ওই শহরেই সীমাবদ্ধ রইলো না। কারণ গবেষণায় দেখা গেলো বেলজিয়ান কঙ্গোর এই রাজধানীটি তখন ছিল গোটা আফ্রিকার সবচেয়ে জনপ্রিয় জায়গা এবং সেখানে মানুষের যাতায়াতও ছিল সবচেয়ে বেশি। তার পরবর্তী ২০ বছর সময়ে রেল যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং হাজার মানুষের যাতায়াতের সুযোগে ভাইরাসটি গিয়ে পৌঁছালো ১৫শ’ কিমি দূরত্বের শহরগুলোতে।   

ভাইরাসটি তখন সংক্রমিত হয়েছে কিন্তু সেই সংক্রমণ বিস্ফোরণের পর্যায়ে যায়নি। বিস্ফোরণের জন্য আদর্শ সময় দেখা দিল ১৯৬০ সালে। কারণ ওই দশকের শুরুতে আরেকটি বড় পরিবর্তন হয়েছিল। বেলজিয়ান কঙ্গো স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। ফলে ফরাসি ও হাইতির নাগরিকদের চাকরির জন্য শহরটি একটি আকর্ষণীয় জায়গায় পরিণত হলো। এই সমস্ত ফরাসি ও হাইতির মানুষ যখন কয়েকবছর পরে দেশে ফিরে গেলো তখন আটলান্টিকের আরেক পাশে তারা শরীরে বহন করে নিয়ে গেলো একটি নির্দিষ্ট ধরনের এইচআইভি-১ গ্রুপ ‘এম’ সাবটাইপ বি ভাইরাস। 

যুক্তরাষ্ট্রে ভাইরাসটি পৌঁছায় ১৯৭০ সালে যখন নিউইয়র্ক এবং সান ফ্রান্সিস্কোর মত বড় শহরে যৌন স্বাধীনতা এবং সমকামিতা নিয়ে শুরু হয়েছে তোড়জোড়। কাজেই এইচআইভি ভাইরাস আরেকবার সামাজিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির সুযোগে দ্রুত ছড়িয়ে পড়লো আমেরিকা এবং ইউরোপে। তবে ফারিয়া বলেছেন, ‘অন্য ধরনের এইচআইভি ভাইরাস যে এটার মতো এতো দ্রুত পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তো পারতো না সেটা মনে করার কোনো কারণ নাই।’ এইচআইভি ভাইরাস ছড়ানোর গল্প কিন্তু এখানেই শেষ না। পরবর্তী সময়ে আরও অনেক ভাবে এই ভাইরাস ছড়িয়েছে।  

যেমন, ২০১৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিয়ানা অঙ্গরাজ্যে ইঞ্জেকশানের মাধ্যমে ওষুধ দেয়ার সময় এই ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটে। ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের রাজধানী বোস্টনের হার্ভার্ড স্কুল অ্যান্ড পাবলিক হেলথের প্রফেসর ইয়োনাটান গ্রাড বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের রোগ নিয়ন্ত্রণ ও নিরাময় কেন্দ্রে এইচাইভি জিনোম এবং সংক্রমণের স্থানকাল সংক্রান্ত তথ্য বিশ্লেষণ করেছে। এই বিশ্লেষণ রোগের প্রাদুর্ভাবের সীমানা বুঝতে ব্যাপকভাবে সহায়তা করেছে।’ 

এ ধরনের বিশ্লেষণ অন্যান্য রোগের প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণ করতেও সাহায্য করবে। ২০১৪ সালে গ্রাড এবং তার সহকারী মার্ক লিপসিচ নিরারোগ্য যৌনরোগ ‘গনারিয়ার’ উপরে একটি তদন্তের ফলাফল প্রকাশ করেন। লিপসিচ বলেন, ‘যেহেতু আমরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শহরের মানুষদের কাছ থেকে নমুনা সংগ্রহ করেছি সেহেতু আমরা প্রমাণ করতে পারব রোগটা কোন জায়গা থেকে শুরু করে কোন জায়গায় গিয়ে ছড়িয়েছে।’ 

কাজেই এই গবেষণা পদ্ধতিটি এমন যে এর মাধ্যমে এইচাইভি বা নিরারোগ্য যৌনরোগের মত মরনঘাতী ব্যধি সমাজে ঠিক কিভাবে বংশবিস্তার করে সেটা বোঝা সম্ভব।





সম্পাদক মণ্ডলীর সভাপতিঃ এনামুল হক শাহিন
প্রধান সম্পাদকঃ সিমা ঘোষ
সম্পাদকঃ নরেশ চন্দ্র ঘোষ

ঠিকানাঃ
২৩/৩ (৪ তালা), তোপখানা রোড, ঢাকা-১০০০
ফোনঃ ০২৯৫৬৭২৪৫, ০১৯৭৭৭৬৮৮১১
বার্তা কক্ষঃ ফাক্সঃ ০২৯৫৬৭২৪৫, ০১৬৭৬২০১০৩০
অফিসঃ ০১৭৯৮৭৫৩৭৪৪,
Email: editoropennews@gmail.com



ভারপ্রাপ্ত সম্পাদকঃ নুরে খোদা মঞ্জু
ব্যাবস্থাপনা সম্পাদকঃ গাউসুল আজম বিপু
বার্তা সম্পাদকঃ জসীম মেহেদী
আইটি সম্পাদকঃ সাইয়িদুজ্জামান